
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের গণপরিষদে গৃহীত হয় সংবিধান। কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর। আজ সংবিধান গ্রহণের ৫৪ বছর। সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান, নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারে আছে আইনের শাসন, সমতা, মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। এখন প্রশ্ন, এসব অধিকার সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব হয়ে উঠেছে?
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে রয়েছে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার। একজন দরিদ্র মানুষ থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে কিংবা আদালতে ন্যায়বিচার চাইতে গেলে কতটা সহজে সেবা পান? ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলে কাগজে লেখা সমতা অর্থ হারায়। আইন সবার জন্য সমান হওয়া যেমন প্রয়োজন, তার প্রয়োগও সমানভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।
নাগরিক অধিকার মানে শুধু ভোট দেওয়া বা মত প্রকাশ নয়। নিরাপদে চলাফেরা, বৈষম্য ছাড়া শিক্ষা ও কাজের সুযোগ, ন্যায্য সরকারি সেবা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়াও এর সঙ্গে জড়িত। নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের অর্জন অসম্পূর্ণ থাকে। রাষ্ট্রের মর্যাদা তখনই বাড়ে, যখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও নিজের অধিকার দাবি করতে ভয় পান না।
সংবিধানের ইতিহাসে সংশোধন, রাজনৈতিক সংকট ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ভিন্নমত এসেছে। এ বিতর্ক স্বাভাবিক। তবে কোনো পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণের অধিকার, ক্ষমতার জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য। ক্ষমতার সুবিধা অনুযায়ী নিয়ম বদলালে সংবিধানের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে যুক্তিসংগত আলোচনা বন্ধ রাখলেও সমস্যার সমাধান হয় না।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদীয় তদারকি, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ জরুরি। সিদ্ধান্তের কারণ জানা, অভিযোগের তদন্ত ও ভুলের প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সংবিধানের প্রতি আনুগত্য কেবল শপথের বাক্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দপ্তরের কাউন্টার থেকে আদালত পর্যন্ত প্রতিটি সেবায় তার প্রমাণ থাকতে হবে।
নতুন প্রজন্মের কাছেও সংবিধানকে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া দরকার। নিজের অধিকার ও দায়িত্ব না জানলে নাগরিক অনেক সময় অন্যায়কে নিয়তি বলে মেনে নেন। বিদ্যালয়ে নাগরিক শিক্ষা, সরকারি তথ্যের সহজ প্রাপ্যতা এবং মুক্ত আলোচনার পরিবেশ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সংবিধানকে দূরের কোনো জটিল বই নয়, দৈনন্দিন জীবনের অধিকার ও দায়িত্বের দলিল হিসেবে বুঝতে শেখাতে হবে।
সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৫৪ বছর পূর্তিতে তাই আনুষ্ঠানিক স্মরণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের হিসাব। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই ক্ষমতা নাগরিকের কল্যাণে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রশ্নটি আরও বড়। সংবিধানের সত্যিকারের মর্যাদা রক্ষিত হবে তখনই, যখন একজন সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বলতে পারবেন, আইন আমারও, রাষ্ট্র আমারও।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলী কদর পলাশ,, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ব্যারিস্টার তানভীর হাসান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আশরাফুল আলম চঞ্চল, সম্পাদক ও প্রকাশক আলী কদর পলাশ কর্তৃক আলিফ প্রিন্টিং প্রেস ২২১ ফকিরাপুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত। কর্পোরেট অফিস: হাউস নম্বর ১৭, রোড নং ২৮, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯। ই-মেইলঃ dailyeiamardesh@gmail.com মোবাইল- +৮৮-০১৭৫৮২৮২৩৪৫
Copyright © 2026 Ei Amar Desh । এই আমার দেশ. All rights reserved.