৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৯:৫২ অপরাহ্ণ
spot_img
Homeসম্পাদকীয়সোনালি আঁশের হাসি টেকসই হোক

সোনালি আঁশের হাসি টেকসই হোক




চুয়াডাঙ্গার মাঠে এখন সোনালি আঁশের ব্যস্ততা। কোথাও পাট কাটা হচ্ছে, কোথাও আঁটি বেঁধে নেয়া হচ্ছে জাগ দেয়ার জন্য, আবার কোথাও পচানো পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। গ্রামবাংলার চিরচেনা এই দৃশ্য কেবল কৃষকের কর্মব্যস্ততার ছবি নয়; এটি সম্ভাবনারও বার্তা। এ বছর পাটের ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় চুয়াডাঙ্গার কৃষকের মুখে যে হাসি ফুটেছে, তা ধরে রাখা এখন সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় ৯ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় আবাদ বেড়েছে ৪৩৫ হেক্টর। এবার প্রায় ২৫ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, তুলনামূলক কম পোকার আক্রমণ এবং পর্যাপ্ত পানির কারণে পাট চাষে কৃষকের স্বস্তি ফিরেছে। অতিবৃষ্টিতে নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি জমায় জাগ দেওয়ার সমস্যাও অনেকটা কেটে গেছে। পাটের বর্তমান বাজারদরও কৃষকের আশাবাদ বাড়িয়েছে। এক বিঘা জমিতে পাট চাষে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হলেও ভালো ফলনে ১০ থেকে ১২ মণ পাট পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি মণ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় উৎপাদন খরচের তুলনায় ভালো মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে পাটকাঠি বিক্রি থেকেও কৃষকের বাড়তি আয় হচ্ছে। ফলে সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম অনেকটা সামলে নেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে এই সাফল্যকে কেবল একটি মৌসুমের বাজার পরিস্থিতির ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। কৃষকের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনের সময় কৃষককে বেশি দামে সার-বীজ-কীটনাশক কিনতে হয়, অথচ ফসল বিক্রির সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্য দাম না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন হলে ভালো ফলনও কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করতে পারে না। পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই চুয়াডাঙ্গায় পাটের আবাদ বাড়ার এই ইতিবাচক প্রবণতাকে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ এবং পাট জাগ দেয়ার আধুনিক ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন মৌসুমে বাজার তদারকি জোরদার করে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাঁচা পাটের পাশাপাশি পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে জোর দেয়া। পাটের আঁশ, পাটকাঠি কিংবা পাটজাত বহুমুখী পণ্যের ব্যবহার যত বাড়বে, কৃষকের জন্য তত বেশি বাজার তৈরি হবে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে। এতে পাট শুধু কৃষকের একটি মৌসুমি ফসল হয়ে থাকবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা ইতোমধ্যে দেখিয়েছেন, ন্যায্যমূল্য ও অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা পাট চাষে ফিরতে প্রস্তুত। এবার দায়িত্ব সরকারের এই আস্থাকে টেকসই করা। কৃষকের ঘাম, শ্রম ও ঝুঁকির যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগামী মৌসুমে জেলার মাঠে আরও বিস্তৃত হবে পাটের আবাদ। সোনালি আঁশের এই হাসি তখন শুধু কৃষকের মুখেই নয়, সমৃদ্ধ করবে চুয়াডাঙ্গার সামগ্রিক অর্থনীতিকেও। সোনালি আঁশের সুদিন ফিরছে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষকের ন্যায্য অধিকার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Share with