৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
spot_img
Homeসম্পাদকীয়বীমা খাতে আস্থার সংকট, গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা কোথায়

বীমা খাতে আস্থার সংকট, গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা কোথায়



বাংলাদেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন শুধু মূলধন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের নয়, বিশ্বাসের। একজন মানুষ জীবনের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বছরের পর বছর প্রিমিয়াম জমা দেন। অথচ মেয়াদ শেষে কিংবা বিপদের মুহূর্তে নিজের প্রাপ্য অর্থ পেতে তাঁকে যখন কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তখন বীমার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। গ্রাহকের অর্থ নিরাপদ রাখা এবং সময়মতো বৈধ দাবি পরিশোধ করা প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রথম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা পুরো অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক পরিস্থিতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির জীবন বীমা রাজস্ব হিসাবের উদ্বৃত্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা কমেছে। শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি ও অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে। তবে উদ্বৃত্ত কমা মানেই অর্থ আত্মসাৎ নয়। আর পুরোনো অভিযোগকে নতুন আর্থিক অবস্থার সরাসরি কারণ বলারও সুযোগ নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি।

সমস্যাটি একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। এর মধ্যে সাধারণ বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়লেও দাবি পরিশোধে সেই উন্নতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে মনে রাখতে হবে, প্রিমিয়ামের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি গ্রাহকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত অর্থ। সেই অর্থের বিনিয়োগ, সম্পদ ক্রয়, প্রশাসনিক ব্যয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে বসে থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকার বীমা আইন সংশোধন এবং সংকটগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তিতে সম্পদ বিক্রির মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে কিছু গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু সামগ্রিক সমস্যার তুলনায় যথেষ্ট নয়। প্রতিটি কোম্পানির অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ, দাবি পরিশোধের সময়সীমা, সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং পরিচালকদের দায়িত্ব প্রকাশ করা জরুরি।

আমরা মনে করি, প্রথমেই বৈধ দাবি নিষ্পত্তির জন্য বাধ্যতামূলক সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোম্পানির আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন কঠোরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রমাণিত অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বীমা খাতে আস্থা নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বীমার সুশাসন শুধু গ্রাহকের অধিকার রক্ষার বিষয় নয়, জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।

একটি পরিবারের দুর্দিনে বীমার চেক যদি সময়মতো হাতে না পৌঁছায়, তবে কোম্পানির সুউচ্চ ভবন কিংবা আকর্ষণীয় বার্ষিক প্রতিবেদন সেই পরিবারের কোনো কাজে আসে না। বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য মাপতে হবে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে। গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়াই আস্থা ফেরানোর প্রথম শর্ত।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Share with