
● নয় মাসে উদ্বৃত্ত কমেছে ৬১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ● পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ● পুরোনো অভিযোগে বর্তমান পর্ষদের কয়েকজনের নাম ● অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি অজানা
বিশেষ প্রতিবেদক
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩৫৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যেই কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক হিসাবে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির জীবন বীমা রাজস্ব হিসাবে ঘাটতি হয়েছে। বছরের প্রথম নয় মাসে উদ্বৃত্ত কমেছে ৬১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।

পুরোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি কত দূর এগিয়েছে এবং সাম্প্রতিক আর্থিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোনালী লাইফের জীবন বীমা রাজস্ব হিসাবে ৪ কোটি ১ লাখ টাকার ঘাটতি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯১ কোটি ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত কমেছে ৬১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ।
এ সময় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪ টাকা ৭৯ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ধনাত্মক ৭ টাকা ৯৫ পয়সা। তবে জীবন বীমা তহবিলের স্থিতি ৮৯৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৯২৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে সোনালী লাইফের ৩৫৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। তদন্তে সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার বিষয় উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই একটি ভবন ক্রয়ের নামে ১৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ উত্তোলন এবং কোম্পানির অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিভিন্ন লেনদেনকে ভবনভাড়া, ঋণ পরিশোধ ও সফটওয়্যার কেনার অর্থ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আর্থিক অনিয়মের জন্য সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দিকেও অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
এদিকে ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১ জুন আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ১৪১টি ব্যাংক হিসাব এবং ১১টি বিও হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন। তবে ওই আদেশের পর তদন্ত, বিচার এবং অর্থ উদ্ধারের সর্বশেষ অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়নি।
সোনালী লাইফের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের একাধিক সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে।
কোম্পানির ২০২৬ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। ওই সভায় পরিচালক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাফর ইকবাল এনডিসি, ফজলুতুন নেসা, মোস্তফা কামরুস সোবহান, ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল ও ওমর খৈয়াম। ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমান পর্ষদের সদস্য ফজলুতুন নেসা, মোস্তফা কামরুস সোবহান ও ফৌজিয়া কামরুন তানিয়ার নাম পুরোনো আর্থিক অনিয়মের তদন্ত ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশসংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বর্তমান বিচারিক অবস্থা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে বর্তমান পর্ষদের অন্য সদস্যদের পুরোনো অভিযোগে সংশ্লিষ্ট বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
গত আগস্টের বার্ষিক সাধারণ সভায় ২০২৫ সালের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়। একই সভায় কোম্পানির চেয়ারম্যান সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার করেন।
এখন প্রশ্ন হলো, পুরোনো অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বর্তমান পর্ষদ কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে? আদালতের আদেশে অবরুদ্ধ হিসাবগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের কতটা উদ্ধার হয়েছে? আর সাম্প্রতিক আর্থিক সূচকের অবনতি বীমা গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না?
পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ এবং চলতি বছরের আর্থিক সূচকের অবনতি পৃথক বিষয়। একটি অন্যটির সরাসরি কারণ, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে উভয় বিষয়েই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জরুরি।



