
প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন • ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের পুরোনো হিসাব নিয়ে বিতর্ক • কতজন পেয়েছেন জমির দলিল?
বিশেষ প্রতিবেদক
কুয়াকাটায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর আলোচিত ‘হালাল’ রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এর মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে হাজারো বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তা ও জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার জমি ও স্থাপনার মালিকানা বিক্রয় এবং বুকিং হয়েছে। কিন্তু এসব বুকিংয়ের বিপরীতে মোট কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, কতজন সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং কতজনের নামে জমির নিবন্ধিত দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে ১৯০ কোটি টাকা জমা এবং ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও ওই তথ্যকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় নির্মাণাধীন ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পের কাজ গত মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া নির্মাণকাজ পরিচালনা এবং প্রস্তাবিত রেলপথের জন্য চিহ্নিত এলাকার মধ্যে প্রকল্পের একটি অংশ পড়ায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে নিষেধাজ্ঞার ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
প্রকল্পটির চেয়ারম্যান পিরোজপুর ১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। তিনি জামায়াতের প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে। ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রচারণায় তাঁর নাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটেও চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর পরিচয় রয়েছে।
১০ হাজার বুকিং, কত টাকা সংগ্রহ?
গত ১৯ মে অনলাইন সংবাদমাধ্যম এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের আর্থিক লেনদেন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির সাতটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় নয় মাসে ১৯০ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা অবশিষ্ট ছিল বলে দাবি করা হয়।
এশিয়া পোস্টের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক স্বীকার করেছিলেন, প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্যাকেজ কিনেছেন। তবে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি জানিয়েছিলেন, তা ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা হতে পারে। প্রতিবেদনে প্রকাশিত ব্যাংক লেনদেনের হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ আবার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করলেই তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।
মাসুদ সাঈদীও সেই সময় প্রকাশিত আর্থিক হিসাবের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, দেশে ফিরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন।
পরবর্তী সময়ে ২১ মে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ১০ হাজার প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বিক্রির তথ্য সঠিক নয়। বরং প্রায় ১০ হাজার জমি ও স্থাপনার মালিকানা বিক্রয় এবং বুকিং হয়েছে। এর মধ্যে কেউ সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করেছেন, আবার কেউ ২৫ হাজার কিংবা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে বুকিং করে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিনিয়োগকারীদের অর্থ জমি কেনা, ব্যাংক হিসাব ও এফডিআরে সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের কোনো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়নি। তবে এসব দাবির বিপরীতে অক্টোবর মাস পর্যন্ত হালনাগাদ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী কিংবা ব্যাংক হিসাবের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
এ কারণে ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের পুরোনো তথ্যকে বর্তমান অর্থের ঘাটতি কিংবা আত্মসাতের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। একইভাবে কোম্পানির কাছে বিনিয়োগকারীদের কত টাকা পাওনা রয়েছে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পাঁচ লাখ টাকায় মালিকানার প্রতিশ্রুতি
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিটি মালিকানা অংশের মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। এককালীন পরিশোধ করলে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রথমে ২৫ হাজার টাকা বুকিং এবং আরও ২৫ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে বাকি অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় প্রতিটি মালিকানা অংশের বিপরীতে ২৫ বর্গফুট জমি ও নির্মিত স্থাপনায় আনুপাতিক মালিকানা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর মুনাফা বণ্টন এবং নির্দিষ্ট সময় বিনা মূল্যে রিসোর্টে অবস্থানের সুবিধার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
কিন্তু প্রায় ১০ হাজার বুকিংয়ের মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে জমির মালিক হয়েছেন, কতজনের নামে সাবকবলা দলিল নিবন্ধিত হয়েছে এবং কতজন এখনো কেবল বুকিং রসিদ বা চুক্তিপত্রের ওপর নির্ভর করছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জমির নিবন্ধিত মালিকানা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে মালিকানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে টাকা জমা দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিলে দুই ধরনের গ্রাহকের আইনগত অবস্থানও ভিন্ন হতে পারে।
জমি নিয়ে মামলা, রেলপথ নিয়েও জটিলতা
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী মৌজায় প্রায় ২১ একর ৬৬ শতক জমি ঘিরে ইস্তানবুল প্রকল্পের কার্যক্রম চলছিল। এর মধ্যে অন্তত ছয় একর জমির উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় মসজিদ ও কনভেনশন হলের নির্মাণকাজও চলছিল।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানিয়েছেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ করা হয়েছে। কুয়াকাটার মহাপরিকল্পনায় ওই এলাকার জমির একটি অংশ রেলওয়ে স্থাপনার জন্য চিহ্নিত রয়েছে।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ জানিয়েছেন, কুয়াকাটার মহাপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। কুয়াকাটা থেকে পায়রা সমুদ্রবন্দর হয়ে মোংলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইস্তানবুল প্রকল্পের একটি অংশ সেই প্রস্তাবিত রেলপথের মধ্যে পড়েছে।
এদিকে প্রকল্পটির জমির মালিকানা নিয়েও আদালতে মামলা রয়েছে। কলাপাড়ার হাড়িপাড়া এলাকার রাখাইন সম্প্রদায়ের বাসিন্দা উমাচ্যান জমিটির মালিকানা দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা করেছেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির মালিক ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষেরা। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও জমির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
টাকা ফেরতেও ১০ শতাংশ কর্তনের শর্ত
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অর্থ ফেরতের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক স্বেচ্ছায় বুকিং বা মালিকানা বাতিল করতে চাইলে জমা দেওয়া অর্থের ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ও বাতিল ফি কেটে রাখা হবে। অবশিষ্ট টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ১৮২ দিন সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে কিংবা ডাউন পেমেন্টের পর টানা ৬০ দিন কিস্তি বন্ধ থাকলে গ্রাহকের বরাদ্দ বাতিল করার অধিকারও সংরক্ষণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে প্রশাসনিক নির্দেশে নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
যা বলছেন মাসুদ সাঈদী ও কর্তৃপক্ষ
নির্মাণকাজ বন্ধের বিষয়ে মাসুদ সাঈদী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের একটি অংশের অনুমোদন ছিল না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রকল্পের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. মনির মুসুল্লী দাবি করেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের অনুমোদন চেয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। কুয়াকাটা পৌরসভা থেকেও অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, হাজারো বুকিংয়ের বিপরীতে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং সেই অর্থের বর্তমান অবস্থান কী?
প্রকল্পে কতজন পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগকারী রয়েছেন, কতজন কেবল বুকিং করেছেন, কতজন জমির নিবন্ধিত দলিল পেয়েছেন এবং বিনিয়োগের কত টাকা জমি, নির্মাণকাজ ও ব্যাংক আমানতে রয়েছে, তা জানার অধিকার সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের রয়েছে।
একই সঙ্গে ১৯ মে প্রকাশিত ১৯০ কোটি টাকা জমা ও ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের হিসাবের বিপরীতে কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা, ব্যাংক বিবরণী এবং এফডিআর সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতা নিরসন করে প্রকল্পের নির্মাণকাজ আবার শুরু করা সম্ভব হবে কি না, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, এসব প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বেসরকারি পর্যটন প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়া নিছক প্রশাসনিক ঘটনা নয়, যখন সেখানে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের অর্থ জড়িত থাকে। তাই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রতিশ্রুত জমির মালিকানা নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি প্রয়োজন।
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন সেই সাধারণ মানুষ, যাঁরা জমির মালিকানা ও ভবিষ্যৎ মুনাফার আশায় নিজেদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তাঁদের অর্থ ও আইনগত অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি এখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।



