৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
spot_img
Homeফিচারতরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়, সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি কি শুধু কথায়?

তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়, সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি কি শুধু কথায়?



আনা পালাসিও

মূল লেখা: A Future for Europe’s Youth
প্রকাশনা: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট (Project Syndicate)
প্রকাশের তারিখ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬
মূল লেখার ভাবনা অবলম্বনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটসহ বিশেষ রূপান্তর এই আমার দেশ ডেস্ক

ইউরোপের রাজপথে আবার তরুণদের বিক্ষোভ। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রতিবাদ দেখে অনেকের মনে পড়ছে ১৯৬৮ সালের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের কথা। কিন্তু দুটি সময়ের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তখন তরুণেরা প্রচলিত ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। আজকের তরুণেরা বিদ্যমান ব্যবস্থার কাছেই তাদের প্রাপ্য অধিকার চাইছেন। তাঁদের দাবি খুব সাধারণ। ভালো শিক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ চাকরি, সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান এবং পরিবার গড়ার মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

আনা পালাসিও প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আধুনিক ইউরোপের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি, যোগাযোগ, ভ্রমণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার এমন সুযোগ পেয়েছে, যা আগের প্রজন্মের কাছে ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেও তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পরও স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা নেই। আয়ের তুলনায় আবাসনের ব্যয় অনেক বেশি। ফলে স্বাধীনভাবে জীবন শুরু করা কিংবা পরিবার গড়ার সিদ্ধান্ত ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই সংকটের গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যকার ব্যবধান। রাষ্ট্র যখন সমৃদ্ধির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, তখন নাগরিক জানতে চান, সেই সমৃদ্ধির কতটা তাঁর জীবনে পৌঁছেছে। জাতীয় আয় বাড়লেও যদি তরুণের কর্মসংস্থান না হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি তাঁর কাছে অর্থহীন। বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হলেও সাধারণ মানুষের বাসস্থান অধরা থাকলে উন্নয়নের দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

ইউরোপীয় সংহতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে গেছে। প্রযুক্তি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, শিল্প উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে ইউরোপকে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু অতীতের অর্জন রক্ষা করলেই চলবে না। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও শিল্পের ভিত্তিও নির্মাণ করতে হবে।

তরুণদের অসন্তোষকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যায়। তাঁদের হতাশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, সম্পদের অসম বণ্টন এবং নীতিনির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া একজন তরুণ যখন নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পান না, তখন তিনি শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। তাঁর রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই আলোচনার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। আমাদের দেশেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত চাকরি পান না। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলে। অর্থাৎ শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির চাহিদার একটি ব্যবধান রয়ে গেছে। এই ব্যবধান দূর না করলে শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা সনদ বিতরণ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ। ব্যবসা শুরু করতে মূলধন, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশের সুবিধা প্রয়োজন। অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতার মুখোমুখি হন। নতুন উদ্যোগের ঝুঁকি বহনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ চাকরির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থেকে যান। তাঁদের উদ্ভাবনী শক্তি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হয় না।

আবাসনের সমস্যাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বড় শহরে বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ তরুণ কর্মজীবীদের সঞ্চয়ের সামর্থ্য কমিয়ে দিচ্ছে। একটি স্থায়ী আয় থাকলেও পরিবার গড়া বা ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করা অনেকের পক্ষে কঠিন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এই অভাব দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই তরুণদের জন্য নীতিনির্ধারণে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।

সরকারের প্রতিশ্রুতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তার বাস্তবায়ন পরিমাপ করা যায়। কতজন প্রশিক্ষণ পেলেন, সেই সংখ্যার পাশাপাশি কতজন কাজ পেলেন, সেটিও প্রকাশ করতে হবে। কত টাকা উদ্যোক্তা ঋণ বিতরণ হলো, তার সঙ্গে কতটি ব্যবসা টিকে থাকল এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো, সেই হিসাবও জরুরি। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন প্রচার দিয়ে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন দিয়ে করতে হবে।

আনা পালাসিওর বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় শিক্ষা এখানেই। তরুণেরা অসাধ্য কিছু চাইছেন না। তাঁরা এমন একটি সমাজ চান, যেখানে পরিশ্রম ও যোগ্যতার বিনিময়ে সম্মানজনক জীবন গড়া সম্ভব। এই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে উন্নত অর্থনীতিও সামাজিক অসন্তোষ থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী এক বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে নিজে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা।

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য তার তরুণদের চোখের দিকে তাকানো যথেষ্ট। সেখানে যদি স্বপ্নের বদলে অনিশ্চয়তা জমে, তবে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যত উজ্জ্বলই হোক, কোথাও একটি গভীর ঘাটতি রয়ে গেছে।

একজন বৃদ্ধ মালী প্রতিদিন বাগানের পুরোনো গাছগুলোতে পানি দিতেন। কিন্তু নতুন চারাগাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছিল। পথচারী জানতে চাইলেন, নতুন গাছগুলোতে পানি দিচ্ছেন না কেন? মালী বললেন, পুরোনো গাছগুলোই তো এখন ফল দেয়। পথচারী উত্তর দিলেন, আজকের চারাগাছ বাঁচিয়ে না রাখলে আগামীকাল ফল পাবেন কোথায়?

রাষ্ট্রের অর্থনীতিও সেই বাগানের মতো। আজকের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী দিনের সমৃদ্ধি কেবল প্রতিশ্রুতিই থেকে যাবে।

লেখক পরিচিতি: আনা পালাসিও স্পেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান আইন কর্মকর্তা। তিনি বর্তমানে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার। Project Syndicate

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Share with